খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে ঐতিহাসিক কাছারীবাড়ি প্রাঙ্গণে যে বৃক্ষমেলাটি প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবল একটি সাধারণ মেলা নয়, এটি এক অঞ্চলের ইতিহাস, পরিবেশ-সচেতনতা ও অর্থনৈতিক জীবনের মেলবন্ধন। সুন্দরবন-সংলগ্ন এই জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুলতানি ও মোগল আমলের স্মৃতি। সুলতানি আমলে হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর শিষ্য পীর খালাস খাঁ বেদকাশীতে আস্তানা স্থাপন করে এখানে এক বিশাল মিষ্টি পানির দিঘি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপশালী রাজা প্রতাপাদিত্য এই অঞ্চলে দুর্গ নির্মাণ করেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘বড়বাড়ি’ নামে পরিচিত। তার চাচা বসন্ত রায়ের খনন করা ‘লোনা দীঘি’সহ পুরনো ইট, খোদাই করা পাথর আর শীলপুকুর-পদ্মপুকুরের ধ্বংসাবশেষ আজও এই এলাকায় ছড়িয়ে আছে, যা প্রমাণ করে এই মাটি বহু শতাব্দী ধরে শাসন, সংস্কৃতি ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সেই ঐতিহাসিক জনপদেই একসময় কাছারীবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রজা নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে, যে জায়গা ছিল ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলার প্রতীক।
প্রচারের আড়ালে এক স্বপ্নদ্রষ্টা
উত্তর বেদকাশীর সন্তান, সাবেক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এস. এম. নজরুল ইসলাম কৃষি নিয়ে যার সারাজীবনের ভাবনা ও ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন। মাঠে-ঘাটে কাজ করা এই মানুষটি বুঝেছিলেন, সুন্দরবন-সংলগ্ন এই লবণাক্ত জনপদে বৃক্ষের গুরুত্ব কতটা, শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্যও। তার সেই স্বপ্ন থেকেই কয়রা উপজেলার সুজলা-সুফলা ইউনিয়ন বেদকাশীতে একটি কৃষি ও বৃক্ষমেলার পরিকল্পনা মাথায় আসে। অবশেষে ২০০১ সালে বেদকাশীর সকল পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় উদ্যোগে শুরু হয় এই বৃক্ষমেলা। একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বপ্ন কীভাবে সমগ্র জনপদের সামষ্টিক ঐতিহ্যে রূপান্তরিত হতে পারে, কাছারীবাড়ি বৃক্ষমেলা তার একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। ধীরে ধীরে ঐতিহ্যকে ধারণ করে আজ এই আয়োজন সমগ্র খুলনা বিভাগে পরিচিতি পেয়েছে ‘বেদকাশী কাছারীবাড়ি বৃক্ষমেলা’ নামে।
তবে এই স্বপ্নদ্রষ্টার চিন্তা ও পরিকল্পনার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলে একটি প্রশ্ন এসেই যায় যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে গাছ আর মাটির প্রতি ভালোবাসা থেকে এই আয়োজনের বীজ বুনেছিলেন, তার সেই স্বপ্নের মেলা কি সঠিক পথে এগোচ্ছে, নাকি ক্রমে তা নিছক চিত্তবিনোদনের উপলক্ষে পরিণত হচ্ছে?
দুর্যোগ-বিধ্বস্ত জনপদে সবুজের আহ্বান
সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বারবার আঘাতে বিধ্বস্ত এই উপকূলীয় জনপদে বনায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদ থেকেই এই মেলার সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়। ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিক্রি, স্থানীয় নার্সারি ব্যবসায়ীদের উৎসাহ প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-বিনোদনের মধ্য দিয়ে মেলাটি প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে দশ থেকে চৌদ্দ দিন ধরে দূর-দূরান্তের মানুষকে টেনে আনে।
মেলার ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো মঞ্চে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনা। কৃষি, সমাজসেবাসহ সমাজের নানা ক্ষেত্রে যারা এলাকার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন, তাদের সম্মান জানানোর এই রেওয়াজ মেলাকে কেবল বাণিজ্যিক আয়োজন না রেখে একটি সামাজিক মর্যাদার অনুষ্ঠানে পরিণত করে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম জাগিয়ে তুলতে বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়ে থাকে, যা আগামী প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার বীজ বোনার এক প্রশংসনীয় প্রয়াস। মেলা প্রাঙ্গণে বৃক্ষের নানাবিধ উপকারিতা ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে সেমিনার আয়োজনের রীতিও এই মেলাকে নিছক বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করে। কৃষি বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ চাষিদের অংশগ্রহণে এই ধরনের আলোচনা স্থানীয় কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত জ্ঞান বিতরণের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
গৌরবের ছায়ায় অন্ধকার
তবে ইতিহাসের গৌরব যতটা উজ্জ্বল, পরবর্তীতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এই আয়োজনের সুনাম যতটা ছড়িয়েছে, ততটাই ছায়া ফেলেছে মেলাকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, অশ্লীলতা, জুয়া ও মাদকের অভিযোগ, পুতুলনাচ ও সার্কাসের আড়ালে চলা তথাকথিত অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ। যে মেলা শুরু হয়েছিল একজন কৃষি-প্রেমিক মানুষের সৎ স্বপ্ন থেকে, সময়ের সঙ্গে সেই মেলারই কিছু অংশ পরিণত হয়েছে অসাধু চক্রের মুনাফা অর্জনের হাতিয়ারে।
২০০৮ সালে দোকান বরাদ্দ ও আদায়কৃত অর্থ নিয়ে মেলা কমিটির মধ্যে যে অসন্তোষ দেখা দেয়, তা ছিল কেবল শুরু। অভিযোগ উঠেছিল, নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করেও তা হিসাবে দেখানো হয়নি। এরপর ক্রমে মেলায় শুরু হয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যার ফলে ২০১৩ সালে ঘটে আরও গুরুতর ঘটনা চৌদ্দ দিনের মেলায় লাখ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। দৈনিক অনির্বাণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫৬টি স্টলের বিপরীতে মাত্র ২৪টির ইজারা দেখানো হয়েছিল, আর টিকিট বিক্রি, নাগরদোলা, মিনি ট্রেন, মিনি চিড়িয়াখানা থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত আয়ের হিসাব রাখা হয়নি বলে অভিযোগ। মেলা কমিটির সভাপতি মাত্র ৩৮ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে ভাউচার জমা দিলে তা ফেরত পাঠান উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কারণ হিসাবে গরমিল স্পষ্ট ছিল।
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরে অশ্লীলতা, জুয়া ও মাদকের ছড়াছড়ির অভিযোগও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যে মেলাটি একসময় ছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্মল আনন্দ উপভোগের জায়গা, কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের কারণে তা পরিণত হয়েছে অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ। রাতের বেলা কিছু স্টল ও বিনোদনকেন্দ্রে অশোভন কার্যকলাপ, জুয়ার আসর বসা এবং মাদক সেবন-বিক্রির অভিযোগ মেলার মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ সচেতনতা ও সুস্থ বিনোদন এর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের নিয়ে মেলায় যেতে দ্বিধাবোধ করেন, যা একটি ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক আয়োজনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক প্রবণতা।
প্রশ্ন হলো, এই অভিযোগগুলোর পরিণতি কী হয়েছিল? তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও, বাস্তবে জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তার স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন, যা এলাকার পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে গেঁথেছে, তার প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
সমাধানের পথ : কী করা প্রয়োজন
প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে যে মেলা থেকে যথেষ্ট অর্থ সংগৃহীত হয়, তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে এই ঐতিহ্য একসময় কেবল অভিযোগ আর অবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সবার আগে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ মেলা পরিচালনা কমিটি গঠন করা, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং জনস্বার্থই হবে মূল বিবেচ্য বিষয়। স্থানীয় শিক্ষক, সমাজসেবী, সাংবাদিক ও প্রবীণ ব্যক্তিদের এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। স্টল বরাদ্দের ক্ষেত্রে ব্যবসা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও লিখিত চুক্তিভিত্তিক, যেখানে প্রতিটি ব্যবসায়ীর দায়বদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে, বিশেষত অশ্লীলতা, জুয়া বা মাদক-সংশ্লিষ্ট কোনো কার্যকলাপে জড়িত হলে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ বাতিলের শর্ত জুড়ে দেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সুস্থ সাংস্কৃতিক বিনোদন চর্চাকে উৎসাহিত করা জরুরি, লোকগান, পুঁথিপাঠ, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, কৃষিভিত্তিক কুইজ বা আলোচনা অনুষ্ঠানের মতো আয়োজন মেলার পরিবেশকে পরিবারবান্ধব রাখতে সহায়ক হবে।
আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রতিটি স্টলের ইজারা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব অনলাইনে বা প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করে প্রতি বছর মেলা শেষে একটি প্রকাশ্য আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা উচিত। মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত টহল এবং রাত্রিকালীন নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্পৃক্ত করা গেলে তা জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা
কাছারীবাড়ি বৃক্ষমেলা টিকে থাকুক, তবে তা যেন হয় স্বচ্ছ হিসাব, জবাবদিহিমূলক কমিটি এবং প্রকৃত জনস্বার্থের ভিত্তিতে। এই মেলা শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়, বরং একজন মাটির মানুষের স্বপ্নের ধারাবাহিকতা, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে এই জনপদের মানুষকে গাছ লাগাতে, পরিবেশ রক্ষা করতে এবং একসঙ্গে উৎসবে মিলিত হতে শিখিয়েছে। সঠিক পরিচালনা ও আন্তরিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে এই মেলা ভবিষ্যতে কেবল খুলনা বিভাগ নয়, সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে, যেখানে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরিবেশ শিক্ষা, স্থানীয় পর্যটন সম্ভাবনা এবং সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার এক আদর্শ মডেল তৈরি হতে পারে।
স্বপ্ন নিয়ে এই মেলার সূচনা করেছিলেন, তা যেন কালের প্রবাহে অসাধুতার কাছে হেরে না যায়। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিক সমাজ একসঙ্গে উদ্যোগী হলে এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণের বৃক্ষমেলা প্রকৃত অর্থে পরিবেশ, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন হয়ে টিকে থাকতে পারবে কেবল অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও।
খুলনা গেজেট/এনএম

